শনিবার, ২ নভেম্বর, ২০১৩

আগামীকাল ৩ নভেম্বর শোকাবহ জেলহত্যা দিবস।


মানব সভ্যতার ইতিহাসে বেদনাময় এক কলঙ্কিত দিন। বাঙালি জাতিকে নেতৃত্ব শূণ্য করতে আজ থেকে ৩৭ বছর আগে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর মধ্যরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নিভৃত প্রকোষ্ঠে বন্দি মহান মুক্তিযুদ্ধের চার সিপাহসালার ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর জাতীয় চারনেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী এবং আবু হেনা মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের শত্র“রা সেদিন দেশ মাতৃকার সেরা সন্তান এই জাতীয় চারনেতাকে শুধু গুলি চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, কাপুরুষের মতো গুলিবিদ্ধ দেহকে বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে ’৭১-র পরাজয়ের জ্বালা মিটিয়েছিল। কারাগারের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা অবস্থায় এ ধরণের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় শুধু বাংলাদেশের মানুষই নয়, স্তম্ভিত হয়েছিল বিশ্ব।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে এবং ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চারনেতাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যার মাধ্যমে স্বাধীনতার পরাজিত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতির মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মহতী অর্জন স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, প্রগতি, মানবাধিকার, সংস্কৃতি, উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে নস্যাৎ করতে চেয়েছিল; কিন্তু ষড়যন্ত্রকারী অন্ধকারের শক্তি সফলকাম হতে পারেনি।
বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চারনেতার হত্যাকাণ্ড ছিল একই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতা। বিশ্বাসঘাতক খুনিদের পরিকল্পনা, উদ্দেশ্য আজ জাতির সামনে পরিস্কার। মিথ্যা কুয়াশার ধুম্রজাল ছিন্ন করে আজ নতুন সূর্যের আলোর মতো প্রকাশিত হয়েছে সত্য; মূলতঃ হত্যাকারীরা এবং তাদের সহযোগিরা চেয়েছিল পাকিস্তান ভাঙার প্রতিশোধ নিতে, রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ ও অপরিসীম ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনকারী দেশটিকে হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতির আবর্তে নিক্ষেপ করতে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল পুনর্গঠন ও গণতান্ত্রিকতার পথ থেকে সদ্য স্বাধীন সার্বভৌম দেশটিকে বিচ্যুত করা।
এখানেই শেষ হয়নি স্বাধীনতার শত্র“দের ষড়যন্ত্র; ’৭৫-র পর থেকে বছরের পর বছর বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানা মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। বঙ্গবন্ধু ও জেল হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কুশিলব হিসেবে সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ জড়িত থাকার প্রমাণ বেরিয়ে আসছে সময়ের ব্যবধানে। ইতিহাসের পথকে যারা দুর্গম ও দুর্লঙ্ঘ্য করে দিতে চেয়েছিল সংগ্রামী বাঙালি জাতি তা ব্যর্থ করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘকাল এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি জানিয়ে আসছিল; দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য এই যে, ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে উচ্চ আদালতের রায়ে আত্মস্বীকৃত খুনিদের প্রায় সবাই খালাস পাওয়ার পরও ন্যায় বিচারের দাবি থেকে তারা সরে আসেনি। উচ্চতর আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় আপীলের অনুমতি পাওয়ার পর সর্বোচ্চ আদালতে শুনানী শেষে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল চূড়ান্ত রায় ঘোষিত হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বঙ্গবন্ধুরই হাতেগড়া সংগঠন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের কয়েকেজনের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। এখন দেশবাসী আশায় বুক বেধে আছে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার মতো জেল হত্যাকাণ্ডের খুনিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হবে; দেশ কলঙ্কমুক্ত হবে।
জাতীয় চারনেতা হত্যার রায় কার্যকর করা ছাড়া জাতি কলঙ্কমুক্ত হতে পারবে না। আর কলঙ্কমুক্ত হওয়া ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং উন্নতি-অগ্রগতি-সমৃদ্ধির ধারায় জাতির অগ্রসর হওয়া বাস্তবেই অসম্ভব। জাতীয় চারনেতা হচ্ছেন আমাদের জাতীয় বীর। জাতীয় বীরদের রক্তঋণ শোধ না করে জাতি তাঁর ইস্পিত লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হতে পারে না। তাই অবিলম্বে জেল হত্যাকাণ্ডের দায়ে দণ্ডিত পলাতক আসামিদের খুঁজে বের করে রায় কার্যকর করা হবে এটাই জনগণ একান্তভাবে কামনা করে।
ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি পরাধীন শাসনামলের অন্ধকার দিনগুলোতে গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে, মুক্তিযুদ্ধে, স্বাধীন দেশ পুনর্গঠন ও পুনর্নিমাণে এবং আওয়ামী লীগকে জনগণের প্রাণপ্রিয় দলে পরিণত করার কর্মকাণ্ডে বঙ্গবন্ধুর এবং চার জাতীয় নেতার অবদান অবিস্মরণীয়। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীসহ জনগণ তাদের জীবন ও কর্মতৎরপরতার কথা কোনদিন ভুলবে না। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চারনেতার পবিত্র স্মৃতি এবং গৌরবদীপ্ত অর্জনের সাথে নতুন প্রজন্মকে পরিচিতি করানো হোক আজকের

কোন মন্তব্য নেই: